রাকিব হাসান
আজকের ঢাকা যেনো এক জীবন্ত বিষণ্ন শহরের নাম। প্রতিদিন ভোর হতে না হতেই এই শহর যেনো জেগে ওঠে এক যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। যানজট, ধুলাবালি, শব্দদূষণ, বিশৃঙ্খল জনস্রোত, আর নাগরিক সেবার জন্য চরম ভোগান্তি। এক সময়ের প্রাণবন্ত, ছায়াঘেরা ও ছিমছাম এই নগরটি আজ রীতিমতো ভারে নুয়ে পড়েছে। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির প্রধান কারণ একটিই—চরম মাত্রার "অকল্পনীয় কেন্দ্রীকরণ"৷
ঢাকা শহর শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক রাজধানী নয়, একই সাথে অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, ব্যবসায়িক, শিক্ষাবিষয়ক, চিকিৎসা ও সামাজিক রাজধানীও বটে। এই এককেন্দ্রিকতা ক্রমে ঢাকাকে এক অচল ও বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত করছে। এর থেকে উত্তরণে প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত ও কার্যকর নগর বিকেন্দ্রীকরণ (Urban Decentralization), যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে উন্নয়নের ভার সুষমভাবে ভাগ করে দেবে এবং রাজধানীকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে।
ঢাকায় বর্তমানে বাস করে প্রায় দুই কোটি মানুষ। প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ নতুন মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করে জীবিকার সন্ধানে। এই অতিরিক্ত চাপ নগর ব্যবস্থাপনাকে চূড়ান্তভাবে দুর্বল করে ফেলেছে। রাজধানী হওয়ায় দেশের সকল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষায়িত হাসপাতাল, কর্পোরেট হেড অফিস, প্রশাসনিক সচিবালয়, এমনকি বিচার বিভাগের কেন্দ্রবিন্দুও এই একটি শহরে। ফলে ঢাকামুখী অভিবাসনের একটি বাধ্যতামূলক প্রবণতা গড়ে উঠেছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার ধারণক্ষমতার বহুগুণ বেশি মানুষের বসবাস ও কর্মচাপ এর অবকাঠামোগত সংকট তৈরি করছে। বিশুদ্ধ পানি, পরিচ্ছন্নতা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সড়ক সুবিধা নিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে পড়ছেন নাগরিকরা। তাছাড়া, পরিবেশ দূষণের দিক থেকেও ঢাকা আজ বিশ্বের শীর্ষ দূষিত শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম
নগরের বিকেন্দ্রীকরণ মানে শুধুমাত্র ঢাকা শহর থেকে কিছু অফিস সরিয়ে নেওয়া নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত রূপান্তর। এর মধ্যে রয়েছে:
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ- গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো বিভাগীয় শহর বা উপশহরে স্থানান্তর। অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ- শিল্প-কারখানা, অর্থনৈতিক অঞ্চল, এবং আইটি সেক্টর ঢাকার বাইরে প্রতিষ্ঠা। শিক্ষা ও চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণ– নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল অন্যান্য শহরে গড়ে তোলা। পরিবহন কাঠামো উন্নয়ন – আন্তঃজেলা রেল, এক্সপ্রেসওয়ে, নদীপথ উন্নয়নের মাধ্যমে ভৌগোলিক সংযোগ সহজ করা।
কেন প্রয়োজন বিকেন্দ্রীকরণ? ঢাকাকে চাপমুক্ত করতে হলে মানুষকে বিকল্প সুযোগ ও পরিসেবা দিতে হবে অন্যত্র। জেলা-উপজেলায় উন্নত নাগরিক সেবা, কাজের সুযোগ ও আবাসিক সুবিধা থাকলে মানুষ ঢাকামুখী হবে না। ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য রাখতে হলে তাকে একটি স্মার্ট, পরিকল্পিত ও প্রশান্ত নগরে রূপ দিতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া তা অসম্ভব। ঢাকার বাইরের অঞ্চলগুলোতে সমান সুযোগ ও উন্নয়ন নিশ্চিত হলে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য হ্রাস পাবে এবং জাতীয় অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল হবে। ঢাকায় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংকট দেখা দিলে পুরো দেশের প্রশাসন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিকেন্দ্রীকরণ হলে বিকল্প প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব।
বিকেন্দ্রীকরণের সফল উদাহরণ রয়েছে অনেক দেশে। যেমন: মালয়েশিয়া, প্রশাসনিক কাজের চাপ কমাতে কুয়ালালামপুর থেকে সরিয়ে পুত্রজায়াগড়ে তোলা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া সিউলের চাপ কমাতে সেজং নামে একটি নতুন প্রশাসনিক শহর গড়ে তোলা হয়েছে। ভারত বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, পুনে, চেন্নাই—প্রত্যেকটি শহর আলাদা প্রযুক্তি ও শিল্প নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে দিল্লির ওপর চাপ অনেক কমেছে।
একই ভাবে বাংলাদেশকেও চেষ্টা করতে হবে বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব করার। যেমন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বিভাগভিত্তিক হস্তান্তর করা যেতে পারে। রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহ—প্রতিটি বিভাগে একটি করে “Mini Capital” প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, জয়দেবপুরকে Satellite Town হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। বেসরকারি বিনিয়োগকে ঢাকার বাইরে উৎসাহিত করতে কর রেয়াতসহ বিভিন্ন সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
ঢাকার এই নাজুক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হল বিকেন্দ্রীকরণ। কিন্তু একে বাস্তবায়ন করতে হলে দরকার হবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ। নয়তো, উন্নয়ন শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে দেশের অন্য অঞ্চলগুলো উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত থাকবে, এবং রাজধানী ঢাকা অচল নগরে পরিণত হবে। কারণ একটি দেশ তখনই উন্নত হয়, যখন তার সব শহর ও অঞ্চল সমান গুরুত্ব পায়। সেই উন্নয়নের পথে চলতে হলে এখনই সময়।
লেখক: রাকিব হাসান
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ