আসিফ চৌধুরী, বিশেষ সংবাদদাতা, ঢাকা :
ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একটি মাদ্রাসা ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনায় বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক ও ককটেল সদৃশ বস্তু উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তিন নারীকে আটক করা হয়েছে। তবে ঘটনার মূল সন্দেহভাজন শেখ আলামিন এখনো পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আজ শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) বিকাল সাড়ে চারটার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান।
এর আগে শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) বেলা ১১টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকার উন্মুল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার একতলা ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত চারজন আহত হন।
পুলিশ সুপার জানান, বিস্ফোরণের পরপরই এন্টি টেরোরিজম ইউনিটকে অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলকে অপরাধস্থল হিসেবে চিহ্নিত করে তদন্ত শুরু করে। তল্লাশি চালিয়ে একটি মনিটর, বিভিন্ন ধরনের তরল রাসায়নিক এবং চারটি ককটেল সদৃশ বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে বিভিন্ন কন্টেইনারে আনুমানিক ৪০০ লিটার তরল রাসায়নিক পাওয়া গেছে। কয়েকটি কন্টেইনারে ‘হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড’ লেখা ছিল। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলমান থাকায় এখনো সিজার তালিকা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ জানায়, ২০২২ সাল থেকে শেখ আলামিন ও তাঁর স্ত্রী আসিয়া ওই মাদ্রাসাটি পরিচালনা করছিলেন। ভবনের চারটি কক্ষের মধ্যে দুটি মাদ্রাসার কাজে ব্যবহৃত হতো এবং বাকি দুটি কক্ষে তাঁরা পরিবারসহ বসবাস করতেন।
বিস্ফোরণের সময় আসিয়া ও তাঁদের তিন সন্তান ভবনের ভেতরে ছিলেন। আহতদের মধ্যে আছেন আসিয়া এবং তাঁর তিন সন্তান। তাদের বয়স যথাক্রমে ১০ বছর, ২ বছর ও ৬ মাস। আহতদের মধ্যে বড় ছেলে উম্মায়ের তুলনামূলকভাবে বেশি আহত হলেও কারও বড় ধরনের দগ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার বলেন, বিস্ফোরণের পর শেখ আলামিন আহত স্ত্রী ও সন্তানদের প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে তাদের রেখে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
ঘটনার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে একাধিক টিম অভিযান শুরু করে। ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখাও (ডিবি) তদন্তে যুক্ত রয়েছে। পুলিশ জানায়, শেখ আলামিনের স্ত্রী আসিয়া ও তাঁর বড় ভাইয়ের স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার বাসাবো এলাকা থেকে আসমানি খাতুন নামের আরেক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তিনজনকেই গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার জানান, শেখ আলামিনের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি অতীতে দুবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাবাস করেছেন। ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তির পর তিনি প্রথমে অটোরিকশা এবং পরে উবারচালক হিসেবে কাজ করতেন।
বিস্ফোরণের কারণ সম্পর্কে পুলিশ সুপার বলেন, ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে, তবে এখনো লিখিত প্রতিবেদন দেয়নি। প্রাথমিকভাবে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ও এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের ধারণা, রাসায়নিক বিক্রিয়া বা বিস্ফোরকজাত দ্রব্যের কোনো প্রতিক্রিয়ার কারণেই বিস্ফোরণটি ঘটে থাকতে পারে।
জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি বলেন, এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ঘটনাস্থলে কিছু সন্দেহজনক সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে, যা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নাশকতার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে এ মুহূর্তে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
পুলিশের তথ্যমতে, মুফতি হারুন নামের একজন ব্যক্তি মাদ্রাসার অন্যতম পরিচালক ছিলেন এবং ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন। তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন।
পুলিশ সুপার বলেন, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ রাজধানীর একেবারে কাছাকাছি ও জনবহুল এলাকা। সৌভাগ্যক্রমে সময় ও দিনের কারণে বড় ধরনের প্রাণহানি হয়নি। তিনি আশপাশের ভাড়াটিয়া বা সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার আহ্বান জানান।