মো. ছাব্বির হোসাইন >>
আমরা মানুষ, ধর্মে-বর্ণে বৈচিত্র্য থাকলেও সৃষ্টিগতভাবে সব মানুষই এক। সবাইকে মহান আল্লাহ আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। সর্বোপরি তিনি মানুষকে সম্মানিত করেছেন এবং সব সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। জানামতে কোনো ধর্মেই অন্য ধর্মের উপর জুলুম, অত্যাচার ও জোর জবরদস্তির কথা বলা নাই। আর ইসলাম ধর্মে তো নাই-ই। বল প্রয়োগ করে ইসলাম নয়, ইসলামের সৌন্দর্যে ও আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যুগে যুগে মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে। ইসলাম স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছে, ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।’ (সুরা বাকারা-২৫৬) ইসলাম কাউকে জোরপূর্বক মুসলমান বানাতে পারে না। তবে এর অর্থ এই নয়, সব ধর্ম সঠিক। যেকোনো ধর্ম অনুশীলন করলেই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালে মুক্তি মিলবে। এ বিষয়ে আল্লাহ পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে ইসলামই প্রকৃত ধর্ম।’ (সুরা আল ইমরান-১৯)
ধর্মীয় অধিকার:-
প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। মুসলিম সমাজেও অমুসলিমরা নিজেদের পরিমণ্ডলে ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করবে। কাউকেই তার ধর্ম পালনে বাধা দেওয়া যাবে না। তবে অমুসলিমদের যেসব রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠান ধর্ম পালনের অংশ, সেগুলোতে মুসলিমদের অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের দ্বিন তোমাদের, আমার দ্বিন আমার।’ (সুরা : কাফিরুন- ৬)
মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) জগতবাসীর জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ ও অনুকরণীয় ব্যক্তি। কেয়ামত পর্যন্ত যেকোনো মানুষ তাঁর জীবন থেকে পাথেয় গ্রহণ করতে পারে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণের মাধ্যমেও তিনি মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁর উত্তম চরিত্রের সাক্ষ্য দিয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রসুলের অনুসরণের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব-২১)
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে রসুল (সা.)-এর উত্তম আচরণের কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো:-
মানবীয় আচরণ:-
সকল মানুষের প্রতি উদার মনোভাব পোষণ ও মানবীয় আচরণ প্রদর্শন ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। কারণ মানুষ হিসেবে সকলেই সমান। আল্লাহ সকল মানুষকে সম্মানিত করেছেন। পৃথিবীতে রাসুল (সা.)-এর আগমনেও ধর্ম-বর্ণের পার্থক্য করা হয়নি; আল্লাহ তায়ালা তাঁকে সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমত ও করুণা হিসেবে পাঠিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে জগতসমূহের রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।’ (সুরা আম্বিয়া- ১০৭) অর্থাৎ তিনি শুধু মুসলমানদের নবী হিসেবে প্রেরিত হননি। তার উম্মত ভিন্ন ধর্মের লোকেরাও। আর তিনি সারাটি জীবন সেভাবেই সবার কল্যাণের জন্য কাজ করে গেছেন এবং সকলের প্রতি সমান ব্যথিত ছিলেন। একবার রাসুল (সা.)-এর সামনে দিয়ে একটি লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এটি দেখে তিনি দাঁড়ালেন, তখন উপস্থিত সাহাবারা বললেন, এটি ইহুদির লাশ। রাসুল (সা.) তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, সে কি মানুষ নয়? (বুখারি, হাদিস: ১৩১২)
অসুস্থ বা রোগীর সেবা করা:-
অমুসলিম রোগীকে দেখতে যাওয়াও সুন্নত। নবী (সা.) অমুসলিম রোগীদের দেখতে যেতেন এবং তাদের ইমানের দাওয়াত দিতেন। তাদের সেবা করতেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইহুদি নবী (সা.)-এর খেদমত করত। সে অসুস্থ হলে নবী (সা.) তাকে দেখতে গেলেন। তার মাথার দিকে বসে নবীজি বলেন, তুমি ইসলাম গ্রহণ করো। তখন সে তার পিতার দিকে তাকাল। পিতা বলেন, তুমি আবুল কাসেমের (নবীর) অনুসরণ করো। ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করল। তখন নবী (সা.) এই বলে বের হলেন, ‘আল্লাহর শুকরিয়া, যিনি তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়েছেন।’ (বুখারি, হাদি-১২৯০)
প্রতিবেশী ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা:-
সকল ধর্মের মানুষ প্রতিবেশী হতে পারে। প্রতিবেশী যে ধর্মেরই হোক প্রতিবেশী হিসেবে তাদের প্রতি সদয় আচরণ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রদর্শনে কোনো প্রকার ত্রুটি করা যাবে না। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষায় ইসলাম অত্যন্ত তৎপর। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে অবিরত উপদেশ দিচ্ছিলেন, এমনকি আমি ধারণা করলাম যে, আল্লাহ তাদের ওয়ারিশ বানিয়ে দেবেন।’ (বুখারি, হাদিস-৫৬৬৮; মুসলিম, হাদিস-৬৮৫৪) আত্মীয় অমুসলিম হলেও সম্পর্ক রক্ষা করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার মাতা-পিতা যদি তোমাকে পীড়াপীড়ি করে আমার সমকক্ষ দাঁড় করাতে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তুমি তাদের কথা মানবে না, তবে পৃথিবীতে তাদের সঙ্গে বসবাস করবে সদ্ভাবে।’ (সুরা : লোকমান, আয়াত-১৫) আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) বলেন, রসুলের যুগে আমার মা আমার কাছে এলেন মুশরিক অবস্থায়। তখন আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জিজ্ঞাসা করলাম, আমার মা এসেছেন, তিনি অমুসলিম। আমি কি তাঁর আত্মীয়তা রক্ষা করব? নবী (সা.) বলেন, হ্যাঁ, তাঁর সঙ্গে আত্মীয়তা রক্ষা করো। (বুখারি, হাদিস-২৪৭৭)
জান-মালের নিরাপত্তা প্রদান:-
যেসব অমুসলিম মুসলিম দেশে রাষ্ট্রের আইন মেনে বসবাস করে অথবা ভিসা নিয়ে মুসলিম দেশে আসে, তাদের সুরক্ষা এবং জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করল, সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, অথচ তার সুগন্ধ ৪০ বছরের রাস্তার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।’ (বুখারি, হাদিস-২৯৯৫)
পরিশেষে বলা যায়, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহেলিয়াতের যুগে আগমন করে তিনি অন্ধকারে নিমজ্জিত সমাজকে আলোর পথ দেখিয়েছিলেন। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার পরও মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ মমতা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হয়তো আপনি তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে দুঃখে নিজেকে শেষ করে দেবেন, যদি তারা এই কথার প্রতি বিশ্বাস না রাখে।’ (সুরা কাহফ, আয়াত-৬) আমাদের উচিত রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ পালন করা। আমাদের ভেতর যদি রসুল (সা.)-এর আদর্শ পুরোপুরি থাকে অথবা আমরা যদি রসুল (সা.)-এর আদর্শ ধারণ করি তবে আমাদের অর্থাৎ মানুষের মধ্যে কোনো প্রকার অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে না। ভিন্নধর্মী মানুষের প্রতি জুলুম, অত্যাচার করা তো প্রশ্নই ওঠে না। আর যারা এগুলো করেন তারা মানুষ হন -মানুষ।
লেখক:
কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।