রাকিব হাসান:
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি দেশ গঠনে এবং বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে এসেছে। একালের এবং সেকালের ছাত্র রাজনীতির মধ্যে পার্থক্য বিশ্লেষণ করলে ছাত্র রাজনীতির গতি-প্রকৃতি, তার শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা পাওয়া যায়।সেকালের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি আদর্শিক ও প্রেরণামূলক ধারা হিসেবে গণ্য হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল সাহসী ও প্রগতিশীল।
মাতৃভাষা বাংলার জন্য ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে সালাম, রফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে আত্মত্যাগ করেন। এই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
তার ই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে ৬ দফা কর্মসূচি এবং ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে ছাত্ররা নেতৃত্ব দিয়ে আইয়ুব খানের শাসনের পতন ঘটায়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ '১১ দফা' কর্মসূচি গ্রহণ করে, যা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নতুন ধারা সৃষ্টি করে।
দীর্ঘ পথ পারি দিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধবাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনে ছাত্র রাজনীতি এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্ররা মুক্তিবাহিনী ও অন্যান্য প্রতিরোধ সংগঠনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতি ও সংগঠন গুলো তাদের নিজ নিজ স্বকীয়তায় এগিয়ে গেছে। তবে ২১ শতকের বাংলাদেশে যে ছাত্ররাজনীতি চলমান তা মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব্ববর্ত্তী ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্য এবং আদর্শ বজায় রাখে নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভঙ্গুর এই রাষ্ট্রকে নতুন করে গড়ে তুলতে এই ছাত্র সমাজের ভূমিকা ছিল অনন্য। দেশ যখনই ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়, তখন ই ছাত্র সমাজ জেগে ওঠে৷ অপরদিকে দেশের উন্নতিতে বর্তমানের ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।
একালের ছাত্র রাজনীতি আলোচনার পূর্বে বলতে চাই ছাত্র রাজনীতির গুরুত্ব কতটুকু? বাংলাদেশের মত ঐতিহ্যবাহী ছাত্র রাজনীতি আর কোন দেশে নেই। দেশের বিভিন্ন সময়ে ছাত্ররাই নেতৃত্ব দিয়ে বৈষম্যমুক্ত সমাজ গঠন করেছে৷ ১৯৫২ থেকে শুরু করে ২০২৪ অব্দি সকল আন্দোলনেই ছাত্রদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে বর্তমান ছাত্র-রাজনীতির অবস্থা এতোটাই প্রশ্নবিদ্ধ যে সমাজে এর অবস্থান তলানিতে বা নেই বললেই চলে। ছাত্র রাজনীতির এই পরিণতির কারণ কি এবং কেন তা আলোচনা করা যাক।
একালের ছাত্র রাজনীতি একটি মিশ্র চিত্র উপস্থাপন করে। গণতান্ত্রিক শিক্ষার প্রসার, শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও এটি একদিকে দলীয় রাজনীতির প্রভাব ও সহিংসতার কারণে সমালোচিত হচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির এই পথভ্রষ্টের মূল কারণ অযোগ্য নেতৃত্ব এবং দলীয় লেজুড় ভিত্তিক রাজনীতি।
২০১৮ সালের "কোটা সংস্কার আন্দোলন" এবং "নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে" ছাত্রদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তবে এসব আন্দোলনে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, যা ছাত্র রাজনীতির উপর জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যার সবথেকে ভয়াবহ রুপ পুরো বিশ্ব দেখে ২০২৪ সালের "কোটা আন্দোলন" এ। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন দ্বারা সাধারণ ছাত্ররা নির্যাতিত হয়েছে যার উস্কানিদাতা ছিলো ক্ষমতাসীন দল।
এছাড়াও, ক্যাম্পাসে ক্ষমতা দখল, তদবির ও টেন্ডারবাজির মতো অপকর্মে ছাত্র সংগঠনের যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। রয়েছে মাদক, গুম-খুনের মত অভিযোগ। হল দখল, চাদাবাজি, ক্যাম্পাস র্যাগিং, গণরুম ইত্যাদি কারণে কলুষিত হয়েছে ছাত্র সমাজ। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা অর্জনের জন্য মানুষের কাছে ছাত্র রাজনীতি একটি কলঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানের ছাত্র রাজনীতি অনেকাংশে দলীয় রাজনীতির লেজুড়ভিত্তিক হয়ে পড়েছে, যা শিক্ষার পরিবেশ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে বিপন্ন করছে। লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি বলতে মূলত বোঝানো হয়, যখন একটি ছাত্র সংগঠন কোনো রাজনৈতিক দলের সহায়ক বা অনুসারী হিসেবে কাজ করে, যার কারণে তাদের স্বতন্ত্র পরিচয় ও আদর্শ ক্ষুণ্ন হয় এবং তারা দলীয় নেতাদের স্বার্থের অনুসারী হয়ে পড়ে।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেকালের ছাত্র রাজনীতি ছিল আদর্শ ও নৈতিকতায় সমৃদ্ধ, যেখানে জাতীয় ও গণতান্ত্রিক চেতনা ছিল মুখ্য। একালে অনেক ক্ষেত্রে আদর্শের অভাব দেখা যায় এবং ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থ মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেকালের ছাত্র রাজনীতি সামাজিক পরিবর্তনের চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করত। একালের ছাত্র রাজনীতি, বিশেষ করে দলীয় প্রভাবের কারণে, অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ক্ষমতা ধরে রাখার মাধ্যম হয়ে উঠেছে।একালে ছাত্র রাজনীতির চ্যালেঞ্জ হলো প্রগতিশীল এবং ইতিবাচক নেতৃত্ব তৈরি করা। অনেক তরুণ নেতা শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন, তবে তাদের আরও শুদ্ধাচার, গণমুখী কাজ এবং সৎ নেতৃত্বের উদাহরণ স্থাপন করতে হবে।
বর্তমানে, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমীক্ষায় জানা যায়, ৬৫% শিক্ষার্থী মনে করেন ছাত্র রাজনীতি শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কম এবং ক্ষমতার প্রদর্শনীতে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এই অবস্থায় গণতন্ত্র ও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে একটি ইতিবাচক পরিবেশে ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।
তাই বিগত ১৫ বছরের ছাত্র রাজনীতির কলুষিত দিকের পর জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে সবথেকে বড় প্রশ্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হবে কি না। এ নিয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক যুক্তি থাকলেও কোন সিদ্ধান্তে আসা যায় নি। জাতীয় রাজনীতি কিংবা ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির অন্যতম প্রবেশদ্বার হিসেবে ছাত্ররাজনীতিকে মনে করা হয়। তারুন্যের এই বাংলাদেশে বর্তমান তরুণরা লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির বিপক্ষে। ছাত্র রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কাঠামো, চেতনা ও কার্যক্রমে পরিবর্তন এসেছে। একালের এবং সেকালের ছাত্র রাজনীতির তুলনায় বর্তমান ছাত্র রাজনীতিতে আরও আদর্শিক, গঠনমূলক এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা জাতীয় ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তারা মনে করে, রাজনীতি নেতৃত্ব তৈরি করার জন্য ছাত্রদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন তবে ছাত্র নেতারা দলের না হয়ে সাধারণ ছাত্রদের কথা ভাববে, শিক্ষা ও ক্যাম্পাসের উন্নতির জন্য কাজ করবে। সর্বোপরি তারা মনে করে বর্তমানের ছাত্র সংগঠন গুলো তাদের আদর্শ ও ঐতিহ্যেকে ধারণ করে ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনবে এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে কাজ করবে৷
লেখক: বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ঢাকা কলেজ শাখা৷