ঢাকার রাজপথ তখন শিক্ষার্থীদের পদচারণায় গমগম করছে। চারদিকে যেন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছে "কোটা না মেধা/মেধা,মেধা" স্লোগান। আমি তখন ঢাকা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্র। প্রথমে মনে হয়েছিল, এটা বুঝি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাইদের আন্দোলন, কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা সবাই বুঝতে পারলাম এটা সর্বজনীন।
আমি আন্দোলনের বিষয়ে প্রথম জানতে পারি ফেসবুকে। বন্ধুরা শেয়ার করছিল ‘কোটা সংস্কার’ সম্পর্কিত পোস্ট, ভিডিও ও ছবি। কৌতূহল থেকেই পড়তে শুরু করি। বুঝতে পারি, বাংলাদেশে সরকারি চাকরির জন্য বিদ্যমান কোটা পদ্ধতিটি অনেকাংশেই বৈষম্যমূলক ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনেক মেধাবীকে বঞ্চিত করছে। এরপর একদিন ক্লাস শেষে কলেজের মূল ফটকের পাশে দেখি কয়েকজন বন্ধু ছোট একটি আলোচনা করছে। তারাই প্রথম বলে, "চলো আমরাও অংশ নিই, ঢাকা কলেজ তো ঐতিহ্যবাহী ছাত্র আন্দোলনের অংশ!" সেই কথায় সাড়া দিয়েই আমি যোগ দিই। প্রথমে শুধু শ্রোতা ছিলাম, পরে মিছিলের পেছনে হাঁটতে থাকি। ধীরে ধীরে স্লোগান দিতেও শুরু করি ।ঢাকা কলেজের ছাত্র হিসেবে গর্ব বোধ করেছিলাম, যখন দেখলাম কলেজের শত শত শিক্ষার্থী রাজপথে এসেছে, একে অপরকে আগলে রাখছে, গণসংগীত গাইছে, প্রতিবাদের কবিতা পড়ছে।এভাবেই আমি যুক্ত হয়েছিলাম জুলাইয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনে। এটি শুধু একটি আন্দোলনে অংশগ্রহণ ছিল না, বরং এটি ছিল আমার সচেতন হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ—বাধা পেরিয়ে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবার সাহস পাওয়ার ।তার কয়েকদিন পরেই অসুস্থ হয়ে পড়ি এবং দ্রুত নিজ জেলা কিশোরগঞ্জ চলে যাই।হাসপাতালে তিন দিন ভর্তি থাকার পর আবার সুস্থ হয়ে বেরিয়ে পড়ি নিজ জেলার আন্দোলনকারীদের সাথে। কোটা বিরোধী আন্দোলন যখন সরকার পতনের আন্দোলনে গিয়ে দাঁড়ায় তখন প্রতিটা দিন ছিল আমার জন্য আতংকের । ৪ঠা আগস্ট যখন বাংলাদেশের প্রতিটা জেলা প্রতিটা উপজেলা প্রতিটা ইউনিয়নে কঠোরভাবে এক দফা দাবি নিয়ে রাজপথে নামার ঘোষণা আসে তখন আমিও আমার নিজ এলাকা ছাত্রসমাজ নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেই। আমাদের এই আন্দোলনে ছাত্রসমাজ, কৃষক, শ্রমিক ব্যবসায়ী মোট কথায় সবাই আমাদের ডাকে সারা দেয়। ৪ তারিখ বাড়ি পৌঁছাতেই আমার মা কান্না শুরু করে দিয়েছে। কারন আমিই পরিবারের একমাত্র ভরসা। আমার কিছু হয়ে গেলে পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে। আমার মা কান্না করার কারন হচ্ছে, আমার মা বাবাকে সরকারদলীয় লোকেরা ভয় দেখাতে শুরু করে। তখন আমার মা- বাবা মনে করেছিল আমাদের ছেলেটাকে মনে হয় হারিয়ে ফেলবো।সারাটাদিন আমার মা বাবার দুচিন্তা ও ভয়ে ভয়ে কেটেছে। এক পর্যায়ে আমার মা ৪ তারিখ রাত ১১.৪০ মিনিটে ষ্টোক করেন। এই খবর শুনে আমি ছুটে আসি মায়ের কাছে। সেদিন মনে হয়েছিল মাকে হারিয়ে ফেলেছি।মায়ের এই অবস্থা দেখে আমার বাবা সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তখন মনে হয়েছিল আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। তখন রাত ২ টায় মা বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং মা'কে ফিরে পাওয়ার আশ্বাস দেয় ডাক্তার।তখন রাত ৪ টায় ভয়ে ভয়ে লুকিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। এই রাতের কথা মনে হলে এখনও চোখের কোনায় পানি জমে। এমন কাহিনী শুধু আমার সাথে ঘটেনি ঘটেছে হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের পরিবারের সাথে। এমন জুলাই আর চাই না।